Tuesday, January 21, 2025

23>|| পিকনিকের কথা || লিখতে হবে

     || পিকনিকের কথা  ||লিখতে হবে।

      <-------আদ্যনাথ----->


কিছুদিন হল মনে ভীষণ হাঁসফাঁস,

খুঁজতে চাইছিলাম পিকনিকের ইতিহাস।

নানান ভাবনা চিন্তা মনকে করছে তাড়া,

শুধু লেজ খুঁজতেই আমি হলাম ছন্নছাড়া।


পিকনিকের ইতিহাস খুঁজতেই আমি জব্দ, জানলাম পিকনিক একটি ফ্রেঞ্চ শব্দ।    

এ শব্দের তাৎপর্য, প্রকৃতির মাঝে বসে, খাওয়া-দাওয়া আর হৈ হুল্লোড় করা। 


নদীতীরে,পার্কে,বন-বাদারে বা গ্রামের শেষে,

একটু আনন্দ করে খাওয়া সকলে মিলে মিশে। 

মাঠ ময়দান অথবা সবুজে ঘেরা খেত খানি, 

চড়ুইভাতি অথবা বনভোজনের আদর্শ 

স্থান জানি।


চড়ুইভাতির আছে অনেক নাম,

নানা দেশে নানা স্থানে ভিন্য ভিন্য নাম।

ভুলকা ভাত,উত্তরাঞ্চলের এক উৎসবের মতো,

ঠিক যেন আমাদের বনভোজের মতো।


ফসল কাটার পরে খালি মাঠে,

গ্রামবাসী মাতে ভুলকা ভাতে।

মাঠে উনুন বানিয়ে রান্নার করা,

ঠিক যেন আমাদের ছোট বেলা।


মাঠেই নানান রকমের খেলা ধুলা,

কেউ আনছে তরকারি, কেউ তেল, মশলা

সকলে মিলে রান্নার, সে এক মহাভোজের জটলা।

কলাপাতা নিয়ে সারি সারি বসে পড়া

সকলে মিলে একসাথে বসে খাওয়া।


সেদিন ছিল কত রকমারি সব খেলা

গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, হাডুডু,বউচি,

আরও কত খেলা যা প্রায় ভুলেই গেছি।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সব খেলা

রান্না শেষ হতেই কলাপাতা নিয়ে খেতে বসা।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই "চড়–ইভাতি"

বোধ হয় হারিয়ে যাচ্ছে, পিকনিক আর 

আধুনিকতার ভারে।

সেদিনের গ্রাম বাংলার সেই চড়ুইভাতি 

আজ আর পাইনা খুঁজে।


আমরা প্রতিবৎসর পিকনিকে মাতী

এ-যেন আমাদের এক আনন্দের রীতি,

একদিনের এ-হেন আনন্দ রীতি,

আমাদের হৃদয়ে বৎসর ভরের প্রীতি।


চড়ুইভাতি শব্দের উৎপত্তি এক মজার দৃষ্টি ভঙ্গি,

বন বাদাড়ে চড়ুই পাখিদের কিচিরমিচির

মিলে দুই সঙ্গী,

ওদের ডাকের ছন্দ ও সংগৃহীত খাবার একসঙ্গে খাওয়া,

এভাবেই হয়তো চড়ুইভাতি শব্দ খুঁজে পাওয়া। 



শিশু কালে মনেপড়ে শিশুদের সংগ্রহ করা চালে ডালে রান্না খাওয়াই হচ্ছে চড়ুইভাতি। 

পৌষের শীতে কিশোর-কিশোরীরা মিলে, বাড়ি থেকে চাল-ডাল হাঁড়িকড়াই নিয়ে,

খোলা জায়গায় অথবা গাছের নিচে ,

রান্না করে খাওয়া সকলে এক সাথে মিলে।


সেদিনের সেই চড়ুইভাতিতে খাবারের পাশাপাশি দিনভর খেলাধুলা আনন্দ -উৎসব হতো।

শীতের শুরুতেই চড়ুইভাতি জন্য সুন্দর জায়গা বাছা হতো।



আজ আমরা বনভোজ ভুলেই গেছি,

পিকনিক অর্থ শীতকালীন গেটটুগেদার বুঝি। 

ছেলেবেলার সেই চড়ুইভাতি, 

এখন কতোই না রকমফের রীতি।


পিকনিক সয়েছে অনেক বিবর্তন,

পিকনিক প্রথার শুরু বোধহয় 1692 সালে,

সেকালে কয়েকজন মিলে শীতকালে, 

খানাপিনা করতো সরাইখানায় গিয়ে। 


পরে এর সাথে যুক্ত হলো মনোরঞ্জক আড্ডা। 

সেদিনের সেই  পিকনিক ছিল শুধু রাজকীয় আয়োজনে। 

পরে সাধারণ মানুষও মাতে বিকল্প আয়োজনে।


আর সেই রাজা-বাদশার যুগে,

রাজার ছেলেরা সৈন্যসামন্ত নিয়ে,  ভোজনের আয়োজন করতেন বনে-জঙ্গলে গিয়ে।

আর এভাবেই বনভোজনের রেওয়াজ শুরু তখন থেকে।


সময়ের পরিবর্তনের অনেক গল্প হয়েছে পিকনিককে নিয়ে,

আজ বনভোজন হয় ডিজিটাল নিয়মে।

ঠাকুর চাকর রাঁধুনি ও গ্যাসের উনুন নিয়ে।

কেউ পিকনিক করে টুর প্যাকেজ নিয়ে।



আজ পাল্টে গেছে পিকনিকের  রূপ বৈচিত্র্য,

পিকনিকের নামে ভোজন,আনন্দ হৈ-হুল্লোরের চরিত্র।

এ সময় পিকনিক স্পট, ক্যাটারিং কোম্পানি, যাতায়াত ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হয় অনেককেই।

===================

ফরাসী বিপ্লবে পিকনিকের কর্মকর্তা

ফরাসী রাজপুরুষরা,

ফ্রান্স ছেড়ে পালিয়ে অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া, আমেরিকায় জড়ো হয়। বেশিরভাগ পাড়ি দেয় ইংল্যান্ড। 

এভাবেই ফরাসী রাজপুরুষদের সাথে

পিকনিক ফ্রান্স জার্মানী সুইডেন ঘুরে  চলে আসে ইংল্যান্ডে।


(1763 সালে লেডি মেরি কোক বোনকে লেখা চিঠিতে পিকনিক পার্টির কথা উল্লেখ করেছেন) 


(উনিশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডে একত্রে বসে খাওয়ার ‘পিকনিক সোসাইটি’র উদ্ভব ঘটে।)

 ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনে পিকনিক ছিল সামন্ত প্রভুদের এস্টেটের আউটডোরে খাওয়া-দাওয়ার অলস অবসর।


পরে মধ্যবিত্তের জীবনে আসে পিকনিক অবকাশ। ইনডোরের বদলে আউটডোরে পিকনিক হয়ে ওঠে জনপ্রিয়।



চড়ুইভাতির সেকাল-একাল

চড়ুইভাতি বা বনভোজনের ইতিহাস আমাদের বেশ পুরনো। একটা সময় গ্রাম্য আবহে চোখে পড়ত দল বেঁধে রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া। তার আগে সংগ্রহ করা হতো চাল-ডাল, কেউ দিত মসলাপাতি। পাঠা, হাস  না মুরগি? এ দ্বন্দ্ব মেটাতেন মা-কাকিমারা। 

বাড়ির উঠোনেই চলতো রান্না, 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই লাগেজেতো

হুড়ো-হুড়ি।


তাতেই শিশুদের মন  আল্লাদে আটখানা ।

মাটিতে বসে কলাপাতায় সেই ভোজ খাওয়া,

সেএক আনন্দের শিহরণ জাগানো আদরে 

বিভোর হওয়া।

একদল রাঁধতো, অন্যরা  হৈ হুল্লোড়ে মেতে উঠত। 

কাছে নদীতে  বা পুকুরে ডুব সাঁতাররের রেষারেষি চলতো।

চলতো কানামাছি ভোঁ ভোঁ, হাডুডু,

দারিয়াবান্দা, খেলা


অনেকেই মনে করেন  ‘বনভোজনে’র সঙ্গে বাঙালিকে প্রথম পরিচিতি ঘটিয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1911 সালে,

তাঁর প্রকাশিত নাটক  ‘অচলায়তন,’ 

কবিগুরু নতুন শব্দ লেখেন "বনভোজন"। 


চোখের বালি উপন্যাসে আশালতা আর বিনোদিনীর সুন্দর পিকনিকের বেলা হৃদয়ে গেঁথে যায়। 


সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র একটি দৃশ্যে পিকনিকে খেলতে বসে মেমোরি গেম দৃষ্টিনন্দন হয়ে আছে। 


মার্গারেট মিসেলের ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ নির্মিত হয়েছে একদল নগরবাসীর বনে গিয়ে পিকনিকে খাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে।


বনভোজন ও শিক্ষা সফর

বাঙালির জীবনে শীত মৌসুম এখন প্রীতি উৎসবে পরিণত হয়েছে। 

সঙ্গে যোগ হয়েছে বিচিত্র অনুষঙ্গ।


 দর্শনীয় স্থান পর্যটন এলাকা, কিংবা নিসর্গের কোন স্থানে দলবল নিয়ে ভ্রমণে গিয়ে একদিন বা কয়েক দিন অবস্থান পিকনিকের আমেজ পেয়েছে। 


কখনও সবাই মিলে পিকনিকের স্থান নির্ধারণ করা হয়। বনভোজনের আরও আধুনিক নাম হয়েছে শিক্ষা সফর। 


অর্থাৎ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর বিশেষ করে শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে বনভোজন বা শিক্ষা সফরের নামকরণে বনবোজন বা পিকনিক হচ্ছে।


হারিয়ে যাওয়া চড়ুইভাতি

‘একদিন দল বেঁধে ক’জনে মিলে যাই ছুটে খুশিতে হারিয়ে’… মান্না দের কণ্ঠের জাদুকরী গান মনে করিয়ে দেয়। ছেলেবেলার ‘রাঁধাবাড়া খেলা’ আজ কলেজ-ভার্সিটির জীবনে বাসে ‘বনভোজন’ ব্যানার টাঙ্গিয়ে দূরে কোথাও যাওয়া, বিচিত্রানুষ্ঠান কতই না মধুর। 


সুন্দর কণ্ঠের সঙ্গে হেড়ে গলার গানও চলে। 


আজকাল চড়ুইভাতি, বনভোজন বা পিকনিকের তকমা নিয়ে করপোরেট কালচারে রূপ নিয়েছে।

আর আমাদের গ্রামীণ পরিবেশের সেই ছোট্টবেলার চড়ুইভাতি আজ  বিলুপ্ত প্রায়।


আধুনিকতার ছোঁয়ায় চড়ুইভাতি হারিয়ে যাচ্ছে বনভোজন পিকনিক আরো কত নামের ভীরে।

মনেহয় নতুন প্রজন্মের কাছে চড়ুইভাতির  বিশেষত্বটা তুলে ধরা উচিত। এতে করে বাঙালির ঐতিহ্য ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে হাজার বছর ধরে।

=====================



No comments:

Post a Comment